জুলাইয়ের ঘটনাবলীর সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়ের করা মামলার রায় আজ সোমবার ঘোষণা করা হবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে হওয়া এ মামলাকে ঘিরে দেশ-বিদেশে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের হওয়া এ মামলার রায় বাংলাদেশের বিচার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১–এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ আজ সকাল ১১টায় রায় ঘোষণা করবে। বেঞ্চের অন্য সদস্যরা হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। জুলাইয়ের ঘটনার পর পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালের এটি প্রথম রায়।
টেলিভিশন ও অনলাইনে রায়ের সরাসরি সম্প্রচার
ট্রাইব্যুনালের অনুমতিসাপেক্ষে রায়ের অংশ বিশেষ বাংলাদেশ টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। অন্যান্য গণমাধ্যমও বিটিভির ফিড ব্যবহার করতে পারবে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বড় পর্দায় রায় দেখানোরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের অফিসিয়াল ফেইসবুক পেজের মাধ্যমেও সম্প্রচার করা হবে।
আসামি ও মামলার প্রেক্ষাপট
এই মামলার তিন আসামি হলেন—
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান
সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন
তিনজনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ, হত্যার অভিযোগ, উসকানি, ষড়যন্ত্রসহ পাঁচটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ গঠন করা হয়। মামলার একমাত্র গ্রেপ্তার আসামি সাবেক পুলিশ প্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ স্বীকার করে রাজসাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছেন।
জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলী নিয়ে অভিযোগপত্র
প্রসিকিউশনের দাখিল করা অভিযোগপত্রের মোট আকার ৮ হাজার ৭৪৭ পৃষ্ঠা। এর মধ্যে—
তথ্যসূত্র: ২,০১৮ পৃষ্ঠা
জব্দতালিকা ও নথি: ৪,০০৫ পৃষ্ঠা
শহীদদের তালিকা: ২,৭২৪ পৃষ্ঠা
প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই-আগস্টে আন্দোলন চলার সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে মৃত্যুর ঘটনা, আহত হওয়া এবং অন্য সহিংসতার জন্য নির্দেশ ও দায়ের প্রশ্নে তিনজন আসামির ভূমিকা পর্যালোচনার ভিত্তিতেই অভিযোগ গঠন করা হয়। এসব অভিযোগ আদালতে যাচাইযোগ্য প্রমাণ ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে রাষ্ট্রপক্ষ জানায়।
৫টি প্রধান অভিযোগ (পৃথকভাবে স্বীকৃতি দিয়ে উপস্থাপন)
প্রসিকিউশন যে পাঁচটি অভিযোগ আদালতে উত্থাপন করেছে, সেগুলোর সারসংক্ষেপ—
উসকানিমূলক বক্তব্যের পর সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ
১৪ জুলাইয়ের বক্তব্যের পর আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার ঘটনাগুলো ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে।
হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশের অভিযোগ
প্রসিকিউশন দাবি করেছে, আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে এসব অস্ত্র ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যার অভিযোগ
এ ঘটনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি নির্দিষ্ট অভিযোগ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
৫ আগস্ট চাঁনখারপুলে ছয়জনকে গুলি করে হত্যা—এ অভিযোগ
আশুলিয়ায় ‘মার্চ টু ঢাকা’ চলাকালে গুলির পর লাশ পোড়ানোর অভিযোগ
প্রসিকিউশনের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব ঘটনায় নেতৃত্বের দায়িত্ব, নির্দেশ, পরিকল্পনা ও সহায়তার বিষয়গুলো আদালতের মূল্যায়নের জন্য উপস্থাপন করা হয়েছে।
সাক্ষ্যগ্রহণ ও বিচার প্রক্রিয়া
মোট ২৮ কার্যদিবসে ৫৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়।
সাক্ষ্য শুরু: ৩ আগস্ট
সাক্ষ্য শেষ: ৮ অক্টোবর
যুক্তিতর্ক শেষ: ২৩ অক্টোবর
সাক্ষীদের মধ্যে ছিলেন ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তি, আহত ভুক্তভোগী, তদন্ত কর্মকর্তা, গবেষক এবং কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিক। আদালতে দাখিল করা ভিডিও–চিত্র, নথি, জব্দকৃত উপকরণ, সংবাদ প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়।
রাজসাক্ষী হিসেবে সাবেক আইজিপি মামুনের সাক্ষ্য আদালতের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল, যেটি আদালত বিচারিক বিবেচনায় মূল্যায়ন করবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা
রায়কে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন রয়েছে। পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য এবং সেনাবাহিনীও মাঠে কাজ করছে। কিছু জেলায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের প্রত্যাশা
চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম জানান, তারা আদালতে সব প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন এবং ‘ন্যায়সঙ্গত ও স্বচ্ছ’ বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই মামলাটি সম্পন্ন হয়েছে। সর্বোচ্চ শাস্তির প্রার্থনা করা হলেও ট্রাইব্যুনালের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তারা মেনে নেবেন।
সাক্ষ্য ও যুক্তিতর্কের ভিত্তিতে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে প্রসিকিউশন দাবি করেছে।
নারী আসামির জন্য বিশেষ সুবিধার প্রশ্নে প্রসিকিউটরের ব্যাখ্যা
প্রসিকিউটর জানান, আইন অনুসারে রায়ের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষভেদে আলাদা কোনো সুবিধার বিধান নেই। অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তি নির্ধারণ হবে; আর প্রমাণিত না হলে খালাস দেওয়া হবে—এটাই আইনি কাঠামো।
ইন্টারপোল বিষয়ে প্রসিকিউশনের বক্তব্য
যদি কোনও আসামির বিরুদ্ধে সাজা হয়, তাহলে ট্রাইব্যুনালের পরোয়ানা ইন্টারপোলে পাঠানো হবে বলে প্রসিকিউশন জানিয়েছে। সবকিছুই আদালতের আদেশ অনুযায়ী সম্পন্ন হবে।












