আদানির ‘অসম’ বিদ্যুৎ চুক্তি পুনর্বিবেচনায় সরকার

ভারতের Adani Group–এর সাথে স্বাক্ষরিত বহুল সমালোচিত বিদ্যুৎ চুক্তি পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চুক্তির শর্ত,মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া এবং সম্ভাব্য আর্থিক দায় নিয়ে সচিবালয়ে গতকাল দেড় ঘণ্টাব্যাপী এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সরকারের চার মন্ত্রী,প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি ও জ্বালানি খাতের কারিগরি বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।

সূত্র জানায়, আদানির সঙ্গে সম্পাদিত বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) ছাড়াও পূর্ববর্তী সরকারের আমলে করা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অন্যান্য অসম চুক্তিগুলোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত জাতীয় রিভিউ কমিটি ইতোমধ্যে আদানির সঙ্গে করা চুক্তিটিকে “বিশ্বের নিকৃষ্টতর ও বাংলাদেশের জন্য আত্মঘাতী” হিসেবে উল্লেখ করে শর্ত পুনর্বিবেচনা অথবা বাতিলের সুপারিশ করেছে। ওই সুপারিশ নিয়েই মূলত আলোচনায় বসেন নীতিনির্ধারকেরা।

বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই চুক্তিগুলো খতিয়ে দেখা শুরু করেছে। তিনি জানান, জনস্বার্থ ও আন্তর্জাতিক বিধিবিধান বিবেচনায় নিয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা: বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে দ্রুত প্রতিবেদন

শপথ নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সচিবালয়ে প্রথম দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরু করে পবিত্র রমজান, সেচ ও গ্রীষ্ম মৌসুম সামনে রেখে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি সামগ্রিক বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে দ্রুত একটি প্রতিবেদন চেয়েছেন তিনি।

চুক্তির পটভূমি: ২৫ বছরের পিপিএ

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি–এর ঢাকা সফরের সময় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ও আদানির মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০১৭ সালের নভেম্বরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে ১,৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ২৫ বছরের পিপিএ স্বাক্ষরিত হয়।

২০২৩ সালের এপ্রিলে আদানির ঝাড়খণ্ডভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়।


মূল্য ও ব্যয়ের অসঙ্গতি নিয়ে প্রশ্ন

প্রাথমিকভাবে দাবি করা হয়েছিল, আদানির বিদ্যুৎ তুলনামূলক সস্তা হবে। তবে বিপিডিবির তথ্য বলছে, বাস্তবে এই বিদ্যুতের গড় মূল্য অন্যান্য উৎসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

  • ২০২৩–২৪ অর্থবছরে আদানির বিদ্যুতের গড় দাম: প্রতি ইউনিট ১৪ টাকা ৮৭ পয়সা
  • অন্যান্য উৎস থেকে বিদ্যুতের দাম: প্রতি ইউনিট ৮–১০ টাকা
  • অন্য ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের তুলনায় ব্যয়: প্রায় ৮৫% বেশি

চুক্তি অনুযায়ী, বিদ্যুৎ না নিলেও মাসিক ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে বাংলাদেশকে ৪৫০ কোটি টাকার বেশি পরিশোধ করতে হচ্ছে। গত দুই অর্থবছরে বিদ্যুৎ আমদানি বাবদ আদানিকে ২৪ হাজার ৮০ কোটি টাকার বেশি বিল দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত পরিশোধিত অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি বলে সূত্রের দাবি।


‘অস্বাভাবিক’ মূল্য সূচক ও দীর্ঘমেয়াদি দায়

জাতীয় রিভিউ কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেখানে ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের গড় দাম ছিল ৪.৪৬ সেন্ট, সেখানে আদানির সঙ্গে ৮.৬১ সেন্টে চুক্তি করা হয়। পরবর্তীতে শর্তের জটিলতায় ২০২৫ সালে কার্যকর মূল্য দাঁড়ায় ১৪.৮৭ সেন্টে। এর ফলে প্রতিবছর প্রায় ৫০ কোটি ডলার অতিরিক্ত পরিশোধ করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে—২৫ বছরে যা এক হাজার কোটি ডলারের বেশি হতে পারে।

কমিটির সদস্য ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান সংবাদ সম্মেলনে বলেন, চুক্তিতে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির উপাদান পাওয়া গেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, “এমন শর্তে চুক্তি করা যুক্তিসঙ্গত নয়।”


উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আমদানি

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। তবু অপরিকল্পিত স্থাপন ও চাহিদা-সরবরাহ ব্যবস্থাপনার অসামঞ্জস্যের কারণে দেশীয় কেন্দ্র বসিয়ে রেখে আমদানি নির্ভরতা বাড়ছে—যা নিয়ে নীতিগত প্রশ্ন উঠেছে।

চুক্তির আরেকটি বিতর্কিত ধারা অনুযায়ী, ভারতের অভ্যন্তরীণ কোনো কারণে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার দায়ভার আংশিকভাবে বাংলাদেশের ওপর বর্তাতে পারে—এমন আশঙ্কাও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।


সামনে কী সিদ্ধান্ত?

সরকারি সূত্র বলছে, জাতীয় কমিটির সুপারিশ, আন্তর্জাতিক আইন, আর্থিক দায় ও কূটনৈতিক সম্পর্ক—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। চুক্তি পুনর্বিবেচনা, শর্ত সংশোধন কিংবা প্রয়োজন হলে বাতিল—সব বিকল্পই আলোচনায় রয়েছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের এই উচ্চমূল্যের চুক্তি এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নজর রাখছে সংশ্লিষ্ট মহল।

সূত্র-আমার দেশ

Related Posts

দেশের বাজারে কমেছে সোনার দাম ভরিতে ১৫ হাজার ৭৪৬ টাকা

দেশের বাজারে আবারও কমানো হয়েছে সোনার দাম। ২২ ক্যারেটের সোনার দাম প্রতি ভরিতে কমেছে ১৫ হাজার ৭৪৬ টাকা। এতে করে এক ভরি সোনার দাম দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫৫ হাজার ৬১৭…

Continue reading
বাংলাদেশে আইভিএফ হাসপাতাল নির্মাণে তুরস্কের আগ্রহ

স্টাফ রিপোর্টার:বন্ধ্যত্বের চিকিৎসায় বাংলাদেশে সরকারিভাবে এখনো কোনো বিশেষায়িত হাসপাতাল নেই। এ অবস্থায় বাংলাদেশে ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (আইভিএফ) বা সহায়ক প্রজনন প্রযুক্তিনির্ভর হাসপাতাল গড়ার পরিকল্পনা করেছে তুরস্কের ওকান ইউনিভার্সিটি হাসপাতাল। প্রকল্পটি…

Continue reading

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এক্সক্লুসিভ

আইসিটির চিফ প্রসিকিউটর পদে পরিবর্তনের উদ্যোগ, আলোচনায় আমিনুল ইসলাম

আইসিটির চিফ প্রসিকিউটর পদে পরিবর্তনের উদ্যোগ, আলোচনায় আমিনুল ইসলাম

মার-এ-লাগোতে প্রবেশচেষ্টা, সিক্রেট সার্ভিসের গুলিতে যুবক নিহত

মার-এ-লাগোতে প্রবেশচেষ্টা, সিক্রেট সার্ভিসের গুলিতে যুবক নিহত

আদানির ‘অসম’ বিদ্যুৎ চুক্তি পুনর্বিবেচনায় সরকার

আদানির ‘অসম’ বিদ্যুৎ চুক্তি পুনর্বিবেচনায় সরকার

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা:শত শত মার্কিন সেনা সরিয়ে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা:শত শত মার্কিন সেনা সরিয়ে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

ভাষাশহীদদের শ্রদ্ধা, দীর্ঘদিন পর একুশে শহীদ মিনারে জনস্রোত

ভাষাশহীদদের শ্রদ্ধা, দীর্ঘদিন পর একুশে শহীদ মিনারে জনস্রোত

শপথের পরই বৈঠক: ওম বিড়লার হাত ধরে মোদীর চিঠি পেলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক

শপথের পরই বৈঠক: ওম বিড়লার হাত ধরে মোদীর চিঠি পেলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক

এমপি হিসেবে শপথ নিলেন বিএনপি সদস্যরা;প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন তারেক রহমান

এমপি হিসেবে শপথ নিলেন বিএনপি সদস্যরা;প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন তারেক রহমান

আদর্শিক অবস্থানে আপসহীন থাকবে জামায়াত: ডাঃ শফিকুর রহমান

আদর্শিক অবস্থানে আপসহীন থাকবে জামায়াত: ডাঃ শফিকুর রহমান

সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নতুন মন্ত্রিসভার শপথ মঙ্গলবার

সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নতুন মন্ত্রিসভার শপথ মঙ্গলবার

জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিশ্লেষণ: আনুপাতিক ভিত্তিতে উচ্চকক্ষে এগিয়ে বিএনপি

জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিশ্লেষণ: আনুপাতিক ভিত্তিতে  উচ্চকক্ষে এগিয়ে বিএনপি