স্টাফ রিপোর্টার:
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সোমবার নতুন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনী অধ্যাদেশ জারি করেছে সরকার। এতে একগুচ্ছ বড় পরিবর্তনের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে নতুন কিছু বিধান, যা এবারের নির্বাচনের আচরণবিধি ও প্রশাসনিক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।
সেনাবাহিনী ফের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায়
সংশোধিত আরপিওর ২ নম্বর অনুচ্ছেদে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর নাম যুক্ত করা হয়েছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর এ বিধান আর কার্যকর ছিল না। এবার তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অংশ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে।
প্রার্থী হওয়ার নতুন শর্ত
নতুন বিধান অনুযায়ী,
- আদালত ঘোষিত ফেরারি বা পলাতক আসামি কোনোভাবেই প্রার্থী হতে পারবেন না;
- বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার পরিচালনা কমিটি বা গভর্নিং বডিতে থাকা কেউ প্রার্থী হতে পারবেন না;
- কোনো প্রতিষ্ঠানের লাভজনক বা কার্যনির্বাহী পদে থাকা ব্যক্তিও নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।
এছাড়া প্রার্থীদের হলফনামায় দেশে ও বিদেশে আয়ের উৎস এবং সর্বশেষ আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।
হলফনামায় অসত্য তথ্য প্রমাণিত হলে ভোটের পরও ইসি ব্যবস্থা নিতে পারবে।
জামানত ও জরিমানায় বড় পরিবর্তন
মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় প্রার্থীর জামানত ২০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে।
আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড ও দেড় লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক দলকেও জরিমানা করার বিধান যুক্ত হয়েছে।
‘না’ ভোট ফিরে এলো
আরপিওর ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে ফের চালু করা হয়েছে ‘না ভোট’ ব্যবস্থা।
যদি কোনো আসনে একক প্রার্থী থাকেন, ব্যালটে ‘না’ ভোটের ঘর থাকবে।
তবে পুনঃনির্বাচনেও একক প্রার্থী থাকলে তাকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী ঘোষণা করা হবে।
সমান ভোট পেলে লটারির পরিবর্তে পুনঃভোটের বিধান রাখা হয়েছে।
জোট করেও নিজ নিজ প্রতীক
নিবন্ধিত একাধিক দল জোট করে নির্বাচন করলেও প্রার্থীকে নিজ দলের প্রতীকেই ভোট করতে হবে— এমন বাধ্যবাধকতা যুক্ত করা হয়েছে।
ফলে ভবিষ্যতে জোটগুলোর অভ্যন্তরীণ সমঝোতা আরও স্পষ্ট হতে হবে।
পোস্টাল ভোটে প্রযুক্তি সহায়তা
প্রবাসী, সরকারি কর্মকর্তা বা হেফাজতে থাকা ব্যক্তিরা আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ভোটিং এর মাধ্যমে ভোট দিতে পারবেন।
এটি দেশে প্রথমবারের মতো ডিজিটালভাবে সংযুক্ত ভোটাধিকার ব্যবস্থার সূচনা করছে।
ইসির ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি
নতুন আরপিও অনুযায়ী—
- কোনো কেন্দ্রে অনিয়ম বা সহিংসতা ঘটলে ইসি পুরো আসনের ভোট বাতিল করতে পারবে।
- প্রিজাইডিং অফিসারের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছে; তিনি ভোট স্থগিত করে রিটার্নিং কর্মকর্তাকে জানাতে পারবেন।
- গণনার সময় গণমাধ্যমকর্মীরা ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ ও উপস্থিত থাকার সুযোগ পাবেন।
এছাড়া, রিটার্নিং কর্মকর্তা প্রয়োজনে বাতিল ভোট পুনরায় যাচাই করতে পারবেন।
এআই অপব্যবহার নির্বাচনি অপরাধ
সংশোধিত আরপিওতে প্রথমবারের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এর অপব্যবহারকে নির্বাচনি অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ভুয়া ভিডিও, ডিপফেইক বা বিভ্রান্তিকর ডিজিটাল প্রচার করলে শাস্তির মুখে পড়তে হবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা দলকে।
বিশ্লেষণ
নতুন আরপিও সংশোধনকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন— “ডিজিটাল যুগে নির্বাচনি প্রশাসনের আধুনিক রূপ”।
তবে একই সঙ্গে সেনাবাহিনীর ফের অংশগ্রহণ এবং ‘না ভোট’ পুনরায় চালুর বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: নির্বাচন কমিশন ও আইন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন, নভেম্বর ২০২৫










