বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অস্বাভাবিক ও সংকটময় অধ্যায়ের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব শেষ হচ্ছে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের। তার এই স্বল্প সময়ের শাসনামল কীভাবে স্মরণ করা হবে—তা নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক চলছে।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর, এক রক্তক্ষয়ী অস্থিরতার মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেন ৮৫ বছর বয়সী ইউনূস। সহিংসতায় প্রাণ হারান ১,৪০০ জনের বেশি মানুষ। ভেঙে পড়া রাষ্ট্রব্যবস্থা স্থিতিশীল করা, একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের পথ তৈরি এবং কর্তৃত্ববাদী শাসনে ফেরার ঝুঁকি ঠেকাতে কাঠামোগত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়াই ছিল তার ঘোষিত লক্ষ্য।
ড. ইউনূসের নেতৃত্বে নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, পুলিশ ও সংবিধান সংস্কারে একাধিক কমিশন গঠন করা হয়। শেখ হাসিনা সরকারের সময় সংঘটিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও দমন-পীড়নের অভিযোগ তদন্তেও নেওয়া হয় নজিরবিহীন উদ্যোগ। গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন প্রায় দুই হাজার অভিযোগ নথিভুক্ত করে, যাকে মানবাধিকারকর্মীরা অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখছেন।
একই সঙ্গে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের সম্পৃক্ততায় ২০২৪ সালের আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পায়। হাসিনার অনুপস্থিতিতে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তার বিরুদ্ধে রায়ও আসে।
তবে সমালোচকদের মতে, ড. ইউনূস কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছেন। আমলাতান্ত্রিক সংস্কার, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং বিনিয়োগ পুনর্জাগরণে অগ্রগতি ছিল সীমিত। অনির্বাচিত সরকারের সীমাবদ্ধতা ও প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ তার সংস্কার এজেন্ডাকে অনেক ক্ষেত্রেই মন্থর করে দেয়।
ছাত্র আন্দোলনের নেতারা, যারা প্রথমে ইউনূসকে “সবাই গ্রহণ করতে পারে এমন ব্যক্তি” হিসেবে দেখেছিলেন, তার প্রতি এখন শ্রদ্ধার সঙ্গে হতাশাও প্রকাশ করছেন। অন্যদিকে বিএনপি শুরু থেকেই দ্রুত নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নেয় এবং অন্তর্বর্তী সরকারের দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার উদ্যোগের বিরোধিতা করে। জামায়াতে ইসলামী ইউনূসের সংস্কার প্রক্রিয়াকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও সময়ের স্বল্পতার কথা স্বীকার করেছে।
ড. ইউনূস এবার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সাধারণ নির্বাচনের পাশাপাশি সংস্কার প্রস্তাবগুলোর ওপর গণভোট আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছেন। এতে জনগণের সরাসরি সম্মতির মাধ্যমে ভবিষ্যৎ সংসদের ওপর সিদ্ধান্তের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ড. ইউনূস এমন এক সময়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন যখন বাংলাদেশ সম্পূর্ণ ভেঙে পড়তে পারত। তার সবচেয়ে বড় অবদান হতে পারে সেই পতন ঠেকানো। তবে তিনি কাঙ্ক্ষিত কাঠামোগত রূপান্তর ঘটাতে পেরেছেন কি না—তা নির্ভর করবে তার পরবর্তী সরকার কীভাবে এই সংস্কার উদ্যোগগুলো গ্রহণ করে তার ওপর।
একজন আন্দোলনে নিহত কিশোরের মা সানজিদা খান দীপ্তির কথায় উঠে আসে আবেগী বাস্তবতা—
“অন্ধদের দেশে আয়নার কোনো দাম নেই। একজন মানুষ এত অল্প সময়ে আর কতটা করতে পারেন?”
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন শেষে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হলেও, মুহাম্মদ ইউনূসের এই অন্তর্বর্তী অধ্যায় দেশটির ইতিহাসে দীর্ঘদিন আলোচনার কেন্দ্রেই থাকবে।
তথ্যসূত্র-আল জাজিরা










