আগামী ১২ মার্চ সকাল ১১টায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হতে যাচ্ছে। রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন সংবিধান প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সোমবার এই অধিবেশন ডাকা হয়। সংবিধান অনুসারে, সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে প্রথম অধিবেশন আহ্বান বাধ্যতামূলক থাকায় এই অধিবেশন ডাকা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ দিন পর একটি কার্যকর ও অংশগ্রহণমূলক সংসদ কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। সরকার ও বিরোধী দলের সক্রিয় উপস্থিতি থাকলে অধিবেশন প্রাণবন্ত ও উত্তপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নির্বাচনের ফলাফল ও বর্তমান আসন পরিস্থিতি
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়লাভের ফলে সরকার গঠন করেছে। ২৯৭টি আসনের মধ্যে বিএনপি জোট বিজয়ী হয় ২১২টি আসনে। জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১জোট পায় ৭৭টি আসন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একটি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৭টি আসনে জয়ী হন। একটি আসনে প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ভোট স্থগিত হয় এবং দুটি আসনের ফলাফল স্থগিত আছে।
বর্তমানে ২৯৬টি কার্যকর আসনের মধ্যে বিএনপির একক আসন সংখ্যা ২০৮।
প্রথম দিনের সম্ভাব্য কার্যসূচি
সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রথম অধিবেশনেই স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। প্রথম দিনের কার্যসূচিতে শোক প্রস্তাব, সভাপতিমণ্ডলী নির্বাচন, রাষ্ট্রপতির ভাষণ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশ উত্থাপন অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
প্রথম বৈঠকে সভাপতিত্ব নিয়ে আলোচনা
সংবিধান অনুযায়ী, বিদায়ী সংসদের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার নতুন সংসদের প্রথম বৈঠকে সভাপতিত্ব করে থাকেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আগের স্পিকার পদত্যাগ করায় এবং ডেপুটি স্পিকার দায়িত্ব পালন করতে না পারায় কে সভাপতিত্ব করবেন তা নিয়ে আলোচনা চলমান।
সংসদের কার্যপ্রণালি অনুযায়ী, প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতি মনোনীত কোনো সদস্য বা সিনিয়র সংসদ সদস্য প্রথম বৈঠক পরিচালনা করতে পারেন।
সম্ভাব্য বিতর্কের ইস্যু
সংসদ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে,দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি,নগর যানজট,জ্বালানি সংকট,নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি এবং সাংবিধানিক সংস্কার ইস্যু সংসদে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে।
বিরোধী দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা সংসদে গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে জনস্বার্থের বিষয়গুলো তুলে ধরবে। স্পিকার নির্বাচন ও রাষ্ট্রপতির ভাষণের পরবর্তী আলোচনায় তারা সক্রিয়ভাবে অংশ নেবে বলে জানিয়েছেন দলীয় নেতারা।
বিরোধী দলের অবস্থান
জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট জানিয়েছে, তারা ইতিবাচক রাজনীতির চর্চা করতে চায়। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে,সরকারের ভালো উদ্যোগে সহযোগিতা করা হবে এবং জনস্বার্থ বিরোধী কোনো বিষয়ে সাংবিধানিক পদ্ধতিতে আপত্তি তোলা হবে।
বিরোধী দলের কয়েকজন সংসদ সদস্য জানিয়েছেন, সংসদীয় কার্যক্রমে দক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে তারা সাংবিধানিক বিধি-বিধান ও আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া বিষয়ে প্রস্তুতি নিয়েছেন।
সরকারি দলের প্রত্যাশা
সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের মতে, সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে একটি সক্রিয় ও জবাবদিহিমূলক সংসদ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। নতুন সংসদ সদস্যদের বড় অংশই নবীন ও উচ্চশিক্ষিত, ফলে আলোচনা ও বিতর্ক আরও ফলপ্রসূ হবে। সংসদে ভিন্নমত থাকাটা স্বাভাবিক,তবে সব সমস্যার সমাধান সংসদের ভেতরেই হওয়া উচিত।
বিশেষজ্ঞ মত
রাজনীতি বিশ্লেষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপকরা মনে করেন,সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও কার্যকর সংসদ পরিচালনায় সংলাপ ও সহনশীলতা গুরুত্বপূর্ণ। বিরোধী দলের প্রশিক্ষণমূলক প্রস্তুতি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হতে পারে বলে তারা মনে করছেন।
তাদের মতে,সংসদে বিতর্ক ও সমালোচনা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ। তবে তা যেন গঠনমূলক ও জনস্বার্থকেন্দ্রিক হয়,সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সার্বিক মূল্যায়ন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রত্যাশা ও আলোচনা দুই-ই রয়েছে। সরকার ও বিরোধী দলের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে সংসদ কতটা কার্যকর ও জনমুখী হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।









