বিদেশমুখী চিকিৎসা: বাংলাদেশিদের নতুন গন্তব্য এখন তুরস্ক

বিদেশমুখী চিকিৎসা: বাংলাদেশিদের নতুন গন্তব্য এখন তুরস্ক
বিদেশমুখী চিকিৎসা: বাংলাদেশিদের নতুন গন্তব্য এখন তুরস্ক

স্বাস্থ্য ডেস্ক:
বাংলাদেশি রোগীদের বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার প্রবণতা নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরে ভারত ছিল তাদের প্রধান গন্তব্য। তবে জুলাই বিপ্লবের পর থেকে ভারতে যাওয়া রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এখন থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, চীন, মালয়েশিয়া, সৌদি আরবের পাশাপাশি তুরস্ক যোগ হয়েছে নতুন চিকিৎসা গন্তব্য হিসেবে।

তুরস্কের দুইটি হাসপাতাল— ইস্তাম্বুলের ওকান ইউনিভার্সিটি হসপিটাল ও মেডিকানা হাসপাতাল—এ কিডনি ও লিভার প্রতিস্থাপন, হৃদরোগ, অর্থোপেডিকস এবং বন্ধ্যত্ব চিকিৎসায় যাচ্ছেন বাংলাদেশি রোগীরা।


প্রতি বছর বিদেশে যাচ্ছেন ১০ লাখের বেশি রোগী

পর্যাপ্ত অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও মানসম্মত চিকিৎসা না পাওয়ায় প্রতিবছর ১০ লাখের বেশি বাংলাদেশি রোগী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যান চিকিৎসার জন্য। এর মধ্যে ৯০ শতাংশই কিডনি ও লিভার প্রতিস্থাপন, ক্যানসার, হৃদরোগ ও বন্ধ্যত্ব সংক্রান্ত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান।

দেশে গত কয়েক বছরে ২৫টি আইভিএফ (ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন) সেন্টার গড়ে তোলা হলেও বিশেষায়িত সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান না থাকায় বন্ধ্যত্ব চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া রোগীর সংখ্যা কমেনি।


‘দেশে আস্থা রাখতে পারিনি’

দুটি কিডনি অকার্যকর হয়ে পড়া ৭৫ বছর বয়সী সাব্বির সরকার (ছদ্মনাম) প্রথমে পাকিস্তানে চিকিৎসা নেন। তবে সেখানে সংক্রমণের হার বেশি থাকায় পরবর্তীতে তাকে নেওয়া হয় তুরস্কের ওকান ইউনিভার্সিটি হসপিটালে, যেখানে সফলভাবে তার কিডনি প্রতিস্থাপন হয়।

তার ছেলে রোম্মান বলেন,

“দেশে ভালো হাসপাতাল থাকলেও চিকিৎসায় আস্থা পাইনি। জ্বরের চিকিৎসাতেও ১০-১২টা টেস্ট করায়, আচরণ ভালো নয়। অব্যবস্থাপনা আর অনিয়মের কারণে আমরা বাধ্য হয়েছি বিদেশ যেতে।”

তিনি আরও জানান, তুরস্কে চিকিৎসার মান অত্যন্ত ভালো। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে তারা অত্যন্ত কঠোর। ফলে প্রতিস্থাপনের পর বাবা দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন।


চিকিৎসা ব্যয়

রোম্মান জানান, চিকিৎসা ও থাকা-খাওয়াসহ সব মিলিয়ে ২৫ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। “যে মানের সেবা পেয়েছি, তাতে এই খরচ মোটেও বেশি নয়,” বলেন তিনি।


বাংলাদেশিদের জন্য তুরস্কে মেডিকেল ট্যুরিজম

বাংলাদেশিদের তুরস্কে চিকিৎসা গ্রহণে সহায়তা করছে টার্কিশডক (Turkishdoc)—তুরস্ক সরকারের অনুমোদিত একমাত্র মেডিকেল ট্যুরিজম কোম্পানি, যা বাংলাদেশ সরকার কর্তৃকও অনুমোদিত।

কোম্পানিটির সূত্রে জানা গেছে,

  • ২০২৩ সালে যাত্রা শুরু হয় টার্কিশডকের
  • প্রথম বছর (২০২3) তুরস্কে গিয়েছিলেন ৩০ জন
  • ২০২৪ সালের অক্টোবরে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে শতাধিক
  • বর্তমানে আরও ৩০ জন ভিসার অপেক্ষায়, এবং অন্তত ৫০ জন আবেদন করেছেন চিকিৎসার জন্য

অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে তুরস্কমুখী রোগীর সংখ্যা ছয়গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে


তুরস্কের হাসপাতালগুলোর সুবিধা

টার্কিশডক সূত্রে জানা গেছে, তুরস্কে

  • লিভার ও কিডনি প্রতিস্থাপনে সফলতার হার ৯৯%,
  • মৃত্যুহার মাত্র ১%,
  • ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্ল্যান্ট চালু থাকায় দাতার রক্তের সম্পর্ক বাধ্যতামূলক নয়,
  • উন্নত সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় হাসপাতালগুলোতে সংক্রমণ হার প্রায় শূন্য।

টার্কিশডকের কান্ট্রি হেডের বক্তব্য

টার্কিশডকের কান্ট্রি হেড এম নুরুজ্জামান রাজু বলেন,

“বাংলাদেশের চিকিৎসা অনেক উন্নত হলেও এখনো লিভার ও কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্টে পিছিয়ে। তুরস্কে হাসপাতালগুলো ইউরোপীয় মানের হলেও ব্যয় তুলনামূলক কম।”

তিনি জানান,

  • তুরস্কে চিকিৎসা খরচ সিঙ্গাপুরের তুলনায় ১০–১৫% কম,
  • বন্ধ্যত্ব চিকিৎসায় ৮–১০ লাখ টাকা,
  • কিডনি প্রতিস্থাপনে ২০–২৫ হাজার ডলার,
  • লিভারে ৪০–৬৫ হাজার ডলার,
  • বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্টে ৬২ হাজার থেকে ১ লাখ ডলার খরচ হয়।

তিনি আরও যোগ করেন,

“তুরস্কে চিকিৎসা শতভাগ ইসলামী শরীয়াহ মেনে হয়। আইভিএফ প্রক্রিয়ায় কেবল স্বামী-স্ত্রীর স্পার্ম ব্যবহার করা হয়, অন্য কারও নয়।”


ফলোআপ ব্যবস্থাও উন্নত

রোগী ফলোআপের জন্য চিকিৎসককেই বাংলাদেশে আনা হয় বলে জানান নুরুজ্জামান রাজু।

“আগামী ডিসেম্বরেও একজন সার্জন বাংলাদেশে আসবেন ফলোআপ সেবার জন্য।”

আবেদন প্রক্রিয়া সম্পর্কেও তিনি জানান, চিকিৎসার ইতিহাস পাঠানোর তিন থেকে পাঁচ দিনের মধ্যেই চিকিৎসা পরিকল্পনা আসে। রোগী সম্মতি দিলে ভিসা কার্যক্রম শুরু হয়, যা ২১ থেকে ৩০ কর্মদিবসের মধ্যেই সম্পন্ন হয়


উপসংহার:
তুরস্কের আধুনিক চিকিৎসা অবকাঠামো, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, ইসলামী শরীয়াহভিত্তিক চিকিৎসা প্রক্রিয়া এবং তুলনামূলক কম খরচ—সব মিলিয়ে এখন বাংলাদেশি রোগীদের নতুন ভরসা হয়ে উঠছে তুরস্ক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *