জনসমর্থন ও সাংগঠনিক পুনর্জাগরণে উত্থান, বড় জোট গঠনের উদ্যোগে নির্বাচনের প্রস্তুতি পুরোদমে
নিজস্ব প্রতিবেদক | ১৮ অক্টোবর ২০২৫
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘকালীন শাসক দল আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেশ যখন নতুন রাজনৈতিক যুগে প্রবেশ করছে, ঠিক সেই সময়ে জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান ও জাতীয় নির্বাচনে বড় প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তুঙ্গে।
রাজনৈতিক বোদ্ধারা বলছেন, আওয়ামী স্বৈরশাসনের সময় দলটি যেমন রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের শিকার হয়েছে, তেমনি জুলাই বিপ্লবের পর সেই নিপীড়নের প্রতিক্রিয়ায় জনগণের একটি বড় অংশ আবার দলটির দিকে ঝুঁকছে।
🔹 নির্বাচনের আগে জনসম্পৃক্ততা ও তৎপরতা বেড়েছে
বিভিন্ন জরিপ ও ছাত্ররাজনীতির সাম্প্রতিক ঘটনাবলীতে জামায়াতের উপস্থিতি ও প্রভাব বেড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষত, ডাকসু ও জাকসু নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ভূমিধস বিজয় দলটির মাঠপর্যায়ে পুনরায় সংগঠিত হওয়ার সক্ষমতা প্রমাণ করেছে।
দলটির নেতারা বলছেন, “আমরা শুধু আন্দোলনের নয়, সরকার গঠনের প্রস্তুতিও নিচ্ছি। জনরায় পেলে আল্লাহর রহমতে আমরা রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রস্তুত।”
🔹 ইনক্লুসিভ প্রার্থী তালিকা ও বড় জোট গঠনের কৌশল
জানা গেছে, জামায়াতের হাইকমান্ড বৃহত্তর রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে প্রার্থিতা খাতে ‘ইনক্লুসিভিটি’ আনার পরিকল্পনা নিয়েছে। শুধু ইসলামী দল নয়, সমমনা, পেশাজীবী, অবসরপ্রাপ্ত আমলা, সেনা কর্মকর্তা এমনকি অমুসলিম প্রার্থীর সম্ভাবনাও রাখা হচ্ছে। লক্ষ্য একটাই—জনপ্রতিনিধিত্বশীলতা ও গ্রহণযোগ্যতা।
আসন ভাগাভাগির মাধ্যমে ভোট এক বাক্সে আনতে ইসলামি ও সমমনা দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে, এবং সেখানে জামায়াতের পক্ষ থেকে “সর্বোচ্চ ছাড়” দেওয়ারও মনোভাব জানানো হয়েছে।
🔹 আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা
দলটির কৌশল কেবল দেশের অভ্যন্তরেই সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক মহলেও নিজেদের রাজনৈতিক বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা তুলে ধরার চেষ্টা করছে জামায়াত। নির্বাচনের আগে সুশৃঙ্খল প্রস্তুতি, দলীয় কাঠামোর আধুনিকায়ন ও পোলিং এজেন্টদের প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক রূপে নিজেদের উপস্থাপন করছে দলটি।
🔹 ভোট ডাকাতির বিরুদ্ধে ‘শক্ত প্রতিরোধের’ ঘোষণা
ঢাকা-১৫ আসনে গণসংযোগকালে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন—
“আমরা চাই নির্বাচন সুষ্ঠু হোক। কেউ যদি ভোট ডাকাতি করতে আসে, তার হাত ভেঙে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।”
এই বক্তব্য ইতিমধ্যে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে, যা দলটির ‘সহনশীল নয়, প্রতিরোধমূলক কৌশল’ স্পষ্ট করে।
🔹 সমমনা জোট: কারা আছে, কোথায় আলোচনা?
বর্তমানে জামায়াতসহ সাতটি ইসলামি দল পাঁচ দফা দাবিতে অভিন্ন আন্দোলনে রয়েছে। এদের মধ্যে আছে—
- ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (চরমোনাই পীরের দল)
- বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস
- খেলাফত আন্দোলন
- নেজামে ইসলাম পার্টি
- জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা)
- খেলাফত মজলিস
- জামায়াতে ইসলামী
তালিকার বাইরেও এনসিপি, এবি পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদের সঙ্গেও জামায়াত নেতারা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করছেন। তবে এখনো পূর্ণ নির্বাচনি জোট হয়নি। বিভিন্ন দলের বক্তব্য অনুযায়ী, তফসিল ঘোষণার পর জোট বা আসন সমঝোতার চূড়ান্ত রূপরেখা স্পষ্ট হবে।
নেতাদের বক্তব্য: ঐক্যের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
গোলাম পরওয়ার, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন—
“আমরা সবাইকে নিয়েই এগোতে চাই। এমনকি অমুসলিম যোগ্য প্রার্থীও মনোনয়নের বিবেচনায় থাকবে। সরকার গঠনের মানসিক প্রস্তুতি আমাদের আছে।”
আকিদাগত মতপার্থক্য নিয়ে আপত্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন—
“এটা ভুল ব্যাখ্যার ফল। আমরা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকিদাতেই বিশ্বাস করি। কিছু মহল মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে বিভ্রান্ত করছে।”
চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলনের সহকারী মহাসচিব মাওলানা আহমদ আব্দুল কাইয়ুম বলেন—
“এইবার ইসলামি দলগুলো এক হলে জয়ের সম্ভাবনা অনেক। তবে আসন ভাগাভাগির সংখ্যা এখনো ঠিক হয়নি।”
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ জানান—
“আমাদের ৫০ আসনে সমঝোতার পরিকল্পনা আছে। ২৫ অক্টোবর শূরা সভায় জোটের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।”
🔹 ভোটের প্রস্তুতি: মাঠে শক্তিশালী কাঠামো
সূত্র জানায়, সারা দেশে নারী-পুরুষ পোলিং এজেন্টদের বাছাই ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলছে। ভোটকেন্দ্র দখল ও জালিয়াতি প্রতিরোধে মাঠে সক্রিয় থাকতে বলা হচ্ছে নেতাকর্মীদের। কেন্দ্রভিত্তিক কমিটিগুলোকে পুনর্গঠনও শেষ পর্যায়ে।
বিশ্লেষণ: রাজনীতির পুরনো খেলোয়াড়, নতুন দৃশ্যপটে
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জামায়াত এখন একটি নতুন সুযোগের মুখে দাঁড়িয়ে, যেখানে তারা দীর্ঘ সময় পর রাজনীতির মূলধারায় ফেরার বাস্তব সুযোগ পেয়েছে।
তবে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—
- অতীতের ইমেজ ঘোচানো
- নতুন প্রজন্মকে যুক্ত করা
- রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রচারণা মোকাবিলা করা
সংক্ষেপে: জামায়াতের নির্বাচনি কৌশল
| কৌশল | ব্যাখ্যা |
|---|---|
| ইনক্লুসিভ প্রার্থী | আমলা, সেনা, আলেম, অমুসলিম |
| বৃহত্তর ঐক্য | সমমনা ইসলামি দলগুলোর সঙ্গে আসন সমঝোতা |
| ভোট রক্ষা | প্রশিক্ষিত পোলিং এজেন্ট, কেন্দ্র পাহারা |
| জনসম্পৃক্ততা | সভা-সমাবেশ, শিবিরের বিজয় উজ্জীবনী ভূমিকা |
| আন্তর্জাতিক যোগাযোগ | বৈদেশিক লবিং ও বৈধতা বৃদ্ধি |
| নির্বাচন ইস্যু | ৫ দফা দাবি, জুলাই সনদের আইনি বাস্তবায়ন |